Search Bookmarks
You have no alerts.

    স্বপ্নের ধারাবাহিকতা

    by mdnaim

    স্বপ্নের ধারাবাহিকতা

    কাজী মাহবুব

    পুলিশ, মিলিটারি কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের লোকের হাতে ওয়্যারলেস ফোন বা ওয়াকিটকি দেখে শিশুকালে অবাক হতাম। সিগারেটের খালি প্যাকেট কানে চেপে ওজর ওজর বলে অভিনয় করতাম।

    একটু বড় হওয়ার পর দেখলাম যমজ ফোন। তারবিহীন দুজন দুই প্রান্তে আলাপ করত। ভাবতাম, যদি আমার এমন ফোন থাকত! এখন ভাবি, থাকলে কি হতো? কিছুই হতো না। ওই বয়সে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল না। কার সঙ্গে কথা বলতাম?

    প্রযুক্তি তরতর করে ওপরে উঠতে লাগল, সাধারণ মানুষের হাতে এসে পড়ল মোবাইল ফোন। বেটাওয়ালা মোবাইল আমাদের হরগঙ্গা কলেজের ভিপি এর হাতে প্রথম দেখেছিলাম, খুব কাছ থেকে। আমরা তার কাছে ভয়ে যেতাম না। তিনি ছিলেন সিনিয়রদের সিনিয়র। কত ব্যাচ সিনিয়র জানি না। জানার চেষ্টা করিনি। বহু বছর ধরে ছাত্রনেতা। পড়ালেখা ছাড়লেও কলেজ ছাড়েন নি। তার দেহ, মন, প্রাণ ছিল কলেজে। কারণ, কলেজে ছিল তার রিজিকের ব্যবস্থা।

    আইরিন আপার মোবাইল নেড়েচেড়ে ফোন করে মোবাইল ফোনের বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। তখন কল রেট ছিল আঠারো টাকা মিনিট। তিনশ টাকার মেয়াদ ছিল বিশ দিন।

    কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যবিত্তের নাগালে ধরা দিল মোবাইল। অনেক চেষ্টা-তদবির করে সিমেন্স নামের সাদাকালো পুরনো মোবাইল ফোন কিনলাম তিন হাজার টাকায়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম।

    জামালপুর থেকে শিক্ষা লাভের আশায় আসা ভূতপূর্ব ও অভূতপূর্ব বন্ধু বিপ্লবের সঙ্গে প্রথম ফোনে কথা বললাম। ওর আশা শিকেয় তুলে নারীঘটিত কেলেঙ্কারির জন্য ও এলাকা ছেড়েছিল, তারপরও কিছুদিন বন্ধুত্ব জিয়েছিল।

    নিজস্ব মালিকানাধীন সিমেন্স মোবাইলের মাধ্যমে চলছিল বিবাহ-পূর্ব মোবাইল অভিসার। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাতচিত চলছিল লক্কড়ঝক্কড় মার্কা পুরনো মোবাইলটি দিয়ে।

    ইতিমধ্যে ক্যামেরা যুক্ত মোবাইল উঁকি দিতে শুরু করেছিল। দাম বেশ চড়া। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে হই হই রবে চায়নিজ রঙিন মাল্টিমিডিয়া মোবাইল সব বিত্তের মধ্যে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল। পথে ঘাটে কলের গানের মতো বাজতে থাকল পথিকের মোবাইল।

    ক্যামেরা কেনার সুপ্ত বাসনা বসন্তের নতুন কুড়ির মতো বিকশিত হতে থাকল। একসময় সাধ ও সাধ্যের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হলো। সেকেন্ড হ্যান্ড সনি এরিকসন কিনে বিশেষ মুহূর্তগুলো স্মৃতির পাতায় স্থায়ী করে রাখার জন্য মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি করলাম। কিন্তু মেমোরি কার্ড কম্পিউটার একসেপ্ট না করায় তা সব বিস্মৃত হয়ে রইল।

    পরে নকিয়ার একটি মোবাইল কিনলাম। তা কেবল সেকেন্ড হ্যান্ড নয়, বহু হাত ঘুরে আমার হাতে এসে প্রাণ বায়ু ত্যাগ করেছিল।

    কিছু ছবি শুট করেছিলাম।

    একসময় মোবাইলটি মেমোরি কার্ড সহ নষ্ট হয়ে গেলে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য হারিয়ে গেল অলক্ষ্যে।

    আমার এক ভায়রার কারওয়ান বাজারে দোকান ছিল। তিনি কিছুদিন পর পর মোবাইলের মডেল বদল করতেন। জানতে পারলাম, তার দোকানের সামনে পুরনো মোবাইল সেট বিক্রি হয় খুব শস্তায়। সেগুলো অনেকটা চোরাই মাল। শস্তার লোভ সামলানো দায়।

    একটি ভালো মোবাইল সেট কিনে দেওয়ার অনুরোধ করলাম তাকে। তিনি সম্মানের সঙ্গে তা রক্ষা করলেন। তিনি আমাকে বিগত স্যামসাংয়ের কেসিংয়ে চায়নার অখ্যাত এক কোম্পানির একটি টাচ স্ক্রিন সেট কিনে দিলেন মাত্র আড়াই হাজার টাকায়।

    কিছুদিন পর সেটি সমস্যা করতে শুরু করল। মেকারের কাছে গিয়ে জানতে পারলাম, এসব মোবাইল নতুনগুলোর দাম আড়াই হাজার টাকা। পুরনো চার্জার ও হেডফোন ছাড়া একই সেট একই দামে কিনে দিয়ে আমাকে ধন্য করেছিলেন ভায়রা।

    এবার শুরু করলাম কম্পিউটারে ফেসবুক ব্যবহার। নেটের দারুণ সমস্যা। অনেকের কাছে শুনেছি, মোবাইলে নেটের গতি অনেক বেশি। তাই দীর্ঘদিনের পরিচিত এক দোকানদারের কাছে বিষয়টি বললাম। একটি ভালো সেট কেনার আগ্রহ দেখালাম। তিনি আমাকে নকিয়ার একটি পুরনো মোবাইল কেনার পরামর্শ দিলেন। বিশ্বাসের সঙ্গে কিনে নিলাম চার হাজার টাকায়।

    জীবনে প্রথম কক্সবাজারে গিয়ে সেই মোবাইল ক্যামেরায় মনের আনন্দে অনেক ছবি তুললাম। ফেসবুকে আপলোড করলাম। কম্পিউটারে ফেসবুক ওপেন করে নিজের ছবি নিজেই চিনতে পারছিলাম না। আর অপেরা মিনি ব্যবহার করেও বাংলায় স্ট্যাটাস দেওয়া যায়নি।

    শাহিন ভাইকে সমস্যার কথা জানালাম। তিনি আমার ফোনসেট দেখে বললেন, এর ক্যামেরা মাত্র দুই মেগাপিক্সেল আর র‍্যাম ৪৩৭ মেগাবাইট। তিনি আরো বললেন, মেগাপিক্সেল বেশি হলে ছবি ভালো হবে আর র‍্যাম বেশি হলে মোবাইলের গতি বেশি হয়।

    মাত্র কয়েক মাস ব্যবহারের পর মোবাইলটি নষ্ট হয়ে গেল।

    দুলাভাইয়ের একমাত্র শালা তিন মাস দেশে বেড়ানোর সাধ নিয়ে প্রবাসে ফিরে যাওয়ার সময় তার স্ত্রীর ব্যবহৃত নোকিয়া মোবাইলটি আমাকে গিফট করে গেল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিতে হয়েছিল। বউয়ের ঝামটার কাছে কেউ টিকতে পারে না, আমিও না।

    কিছুদিন পর সেটটির স্ক্রিন একেবারে সাদা হয়ে গেল। ফ্ল্যাশ দেওয়া হলো। কিন্তু কনট্যাক্ট নাম সেভ হয় না। কেবল ফেসবুক চালানো আর ক্যামেরার কাজ করা যেত কোনো মতে।

    কথোপকথনের কাজ সেই কিং স্টার চায়নাতেই চলছিল।

    পঞ্চসার, সদর মুন্সীগঞ্জ থেকে
    ০১৮৩৪ ০১৭ ৯২৫

    এপ্রিল ২০১৫

    1. No chapters published yet.
    Note