বিজয়িনী – ইরানি সাহা
বিজয়িনী – ইরানি সাহা
বাবা-মা আদর করে আমাকে লক্ষ্মী বলে ডাকত। যদিও আমার ভালো নাম ছিল রূপা। আর বলত, আমি যে সংসারে যাব সেই সংসারে নাকি আমার আলোয় আলোকিত হবে। কিন্তু বাবা-মা জানত না তাদের আদরের মেয়েটি আজ এই সমাজের মানুষের চোখে সবচেয়ে বড় অলক্ষ্মী, অপয়া।
আমার বিয়ে হয়েছে পনেরো বছর। বাবা-মা খুব আশা করে বড় বাড়িতে আমাকে বিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল তাদের মেয়ে খুব সুখী হবে। কিন্তু মানুষের সব চাওয়া পূর্ণ হয় না। আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো।
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে আমার ভালোই কাটছিল। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, সব মিলিয়ে ভালো ছিলাম। কিন্তু ভাবতে পারিনি আমার স্বপ্নগুলো, স্বপ্নই থেকে যাবে। কখনো কোনো দিন সত্যি হবে না। শ্বশুরবাড়ির সবাই আমাকে খুব ভালোবাসত। আমার স্বামীও মানুষ হিসেবে খুব ভালো ছিল।
কিন্তু সমস্যা হলো তখন, যখন দুই বছর কেটে গেল আমাদের কোনো সন্তান হলো না। তারপর আমি আর আমার স্বামী দুজনেই ডাক্তার দেখলাম। সমস্যা আমারই ছিল। ডাক্তার বললেন, আমি কোনো দিন মা হতে পারব না।
এ কথা শোনার পর আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লাম। ধীরে ধীরে সবাই কেন যেন বদলে গেল। আমার সাথে কেউ ভালো করে কথা পর্যন্ত বলত না। আমার স্বামীও আর সবার মতো করে বলতে গেলে, চেনা মানুষগুলো চোখের সামনে খুব বেশি অচেনা হয়ে গেল।
আমি বড় একা হয়ে গেলাম। যখন মনে হতো আমি কোনো দিন মা হতে পারব না, আমাকে কেউ মা বলে কখনো ডাকবে না তখন মনটা বিষাদে ভরে যেত। এটা কাউকে বোঝানোর মতো ছিল না।
আমার শাশুড়ি একদিন বললেন, একটা অলক্ষ্মী, অপয়া মেয়েকে তোর জন্য ঘরে বউ করে এনেছি। যার জন্য তুই কখনো কোনো দিন বাবা ডাক শুনতে পারবি না। এভাবেই নানা রকম কথা শুনতে হতো আমাকে। আর এখন ওদেরই কেউ সেজে সংসারে জীবনের পথ বন্ধ।
তারপর একদিন বিকেলে শাশুড়ি বললেন, আমরা বড় খোকাকে আবার বিয়ে করাতে চাই। তোমার কি এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি আছে? যদি থাকে তাহলে বলতে পারো।
আমার আপত্তি থাকলেই বুঝি আপনারা তা শুনবেন মা। আপনাদের ছেলে যদি এই বিয়েতে সুখী হয় তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।
আমার ছেলের কথা এখন থেকে তোমাকে আর ভাবতে হবে না। তুমি এবার থেকে তোমার নিজের কথা ভাবো।
আজ থেকে নতুন করে তার আবার মতো আর কিছু নেই মা। আমি একা একজন মানুষ। কোনো না কোনোভাবে দিন ঠিকই কেটে যাবে। আমি নিজেকে নিয়ে আর ভাবি না মা।
কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে রূপা। বলুন, কি বলবেন, যদি কোনভাবে আপনাদের উপকার করতে পারি তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
আসলে আমরা আনন্দের বউ তোমার প্রথম বিয়ের গোপন রাখতে চাই কারণ, এ কথাটা জানলে বড় খোকার বিয়ে করতে অনেক অসুবিধা হবে।
ঠিক আছে, আমি কথা দিলাম মা, এ কথা কখনো কোনো দিন আমার কাছ থেকে কেউ জানতে পারবে না।
তারপর আমরা গ্রামের ভিটেবাড়ি, জমি সব বিক্রি করে শহরে চলে এলাম। যেখানে আমাদের পরিচিত কেউ ছিল না। আবার আমার স্বামীর জন্য নতুন করে পাত্রী দেখা শুরু হলো। অবশেষে পাত্রী পছন্দ করা হলো। তারপর নির্দিষ্ট দিনে বিয়েও হয়ে গেল।
নতুন বউ ঘরে এল। আর আমার জন্য ওই বাসাতেই একটা আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা হলো। নতুন বউয়ের জন্য সব নতুন নতুন আয়োজন। আমার স্বামীকে দেখে মনে হচ্ছে, সে আমাকে কোনো দিন দেখেনি। অন্য তার কাছে একদম অপরিচিত, অচেনা একজন মানুষ। সামনে দিয়ে গেলেও আমার দিকে চোখ তুলে একবার তাকাত না।
আমার স্বামীর দ্বিতীয় সংসারে এক ছেলে আর এক মেয়ে আছে। দ্বিতীয় বউ এসে আমার স্বামীর সব চাওয়া পূরণ করতে পেরেছে। এটাই আমার কাছে সব চেয়ে বড় পাওয়া। আমার স্বামীর দ্বিতীয় বউ জানে আমি এই বাড়ির পুরনো কাজের মাহিলা।
আজ শুধু একটা সন্তানের জন্য আমাকে স্বামী-সংসার ছাড়তে হলো। সব পরিচয় থেকেও আমি হয়ে গেলাম পরিচয়হীন। হয়তো এটাই আমার নিয়তি।
তারপর হঠাৎ করেই আমার শাশুড়ির শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ল। অনেক চিকিৎসা করানোর পরও তিনি আর ভালো হলেন না। একদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি ডাক দিলেন, রূপা!
রূপা, আমার কাছে এসে একটু বসবে? তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল। আমি গিয়ে তার পাশে বসলাম। শাশুড়ি মাথায় হাত রাখলেন।
রূপা, আমি অনেক পাপ করেছি। আমি নিজের হাতে তোমার সংসারটা নষ্ট করে দিয়েছি। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও।
কেউ কারো সংসার নষ্ট করতে পারে না মা। যা হওয়ার থাকে, সেটা কেটে ফেরাতে পারে না। এতে আপনার তো কোনো দোষ নেই। মেয়ের কাছে মায়ের কোনো অন্যায় নেই। মায়ের তো সবাই গুণের স্থান। আপনাকে পেয়ে আমার শুধু কল্যাণ হয়েছে মা।
শেষ পর্যন্ত আমি জিতে গেলাম। আমি আর অলক্ষ্মী, অপয়া নই। আমিও মা হতে পেরেছি।
ময়মনসিংহ থেকে
- No chapters published yet.
