Search Bookmarks
You have no alerts.

    নীরব প্রহর

    by mdnaim

    নীরব প্রহর

    মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন

    চৈতি এসেছিল আমাকে কিছু বলার জন্য। আমিও গিয়েছিলাম তাকে কিছু বলব বলে। আমি যেমন স্পষ্ট জানতাম সে কি বলবে, তেমনি সেও হয়তো আন্দাজ করতে পারছিল আমি কি বলব। তবু ভালোবাসাময় উপন্যাসের যবনিকায় কেন যে দুজন আবার মুখোমুখি হয়েছিলাম, সেটা রহস্যই রইল।

    নিরিবিলি পরিবেশের রেস্টুরেন্টটির সাত নাম্বার কেবিনে আমরা যে কতবার গিয়েছিলাম, তার হিসাব ছিল না। ম্যানেজমেন্ট কোনো রেকর্ড রাখলে, পাঁচ বছরের কাগজপত্র ঘাটলে তারা হয়তো বলতে পারবে সেটা আমাদের কততম যাওয়া ছিল। আমরা সেখানে যেতাম পরিবেশের কারণে। তাদের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই আন্তরিক। যদিও টাকার কারণেই দিত এসব।

    আমরা মুখোমুখি বসে ছিলাম অনেকটা সময় ধরে। ওয়েটার বেশ আগেই অর্ডার সার্ভ করে গিয়েছিল। আমরা বেল না টিপলে ওখানে কেউ আসবে না।

    টেবিলের খাবারগুলো যেমন ছিল তেমনই পড়ে ছিল। চৈতি সেই যে দৃষ্টি নিচে দিয়ে বসে ছিল, আর একটুও নড়াচড়া ছিল না। আমিও একইভাবে বসে ছিলাম সেই প্রথম থেকে। ওখানে যাওয়ার পর একটা কথাও বলিনি কেউ কারো সঙ্গে।

    আমার যাওয়ার কোনো ইচ্ছা না থাকলেও চৈতির অনুরোধে তার শেষ কথাটা শুনতে গিয়েছিলাম। আমার সেদিন বলার কিছুই ছিল না। সেও চুপচাপ বসে ছিল।

    কিন্তু গত পাঁচ বছরে যতবার ওখানে গিয়েছিলাম, একবারও কেউ কথা শেষ করে উঠতে পারিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার পরও অসমাপ্ত থেকে যেত কথা। হায়! কোথায় সেই দিনগুলো?

    জানতাম, চৈতির ক্ষমা চাওয়া অথবা কৈফিয়ত উপস্থাপন করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। কিন্তু আমার তো অনেক প্রশ্ন ছিল। সব প্রশ্ন সাজানো ছিল মনে। অদৃশ্য একটা কিছু যেন জিভ অসাড় করে দিয়েছিল সেদিন। তাই কিছুই বলা হচ্ছিল না। কি লাভ আর প্রশ্ন ছুড়ে? যে যাওয়ার সে তো চলেই যাবে।

    চৈতি আর আমার মাঝে কখনো সমতা ছিল না। সার্বিকভাবে বরাবরই সে অনেকটা সরস ছিল আমার থেকে। তাই যখন সে ভালোবাসার ডালি সাজিয়ে নিয়ে আমার কাছে এসেছিল, তখন তাকে স্পষ্ট বলেছিলাম সে কথা। সে আশ্বাস দিয়েছিল সব বাধা ডিঙানোর। তবু আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে নিরাশ না হয়ে বারবার ফিরে এসেছিল। একসময় নিজের অজান্তেই আমি জড়িয়ে গেলাম সেই মায়াবী জালে।

    কিন্তু সেদিন বহুদিন পর আমাকে নিঃশেষ করে দিয়ে চৈতির চোখে আমাদের অসমতা ধরা পড়ল। সে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে সংসারের মায়ায় সমতার কাছে – এ কথা বলতেই আমাকে ওখানে ডেকেছিল।

    সপ্তাহ খানেক আগে থেকে যখন তার বিয়ের ব্যাপারে কথা শুরু হয় তখন না জানলেও দুই পরিবারের ফাইনাল কথাবার্তা হওয়ার পরই সব জানলাম। কিন্তু চৈতি আমাকে কিছুই বলেনি। খুব আঘাত পেলেও চৈতির সমান নই আমি – এই বার্তাকে মেনে নিয়ে নিজেকে মিছে সান্ত্বনা দিলাম।

    আমি পারতাম কৈফিয়ত চাইতে, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে, অন্ধকারে ডুব দিতে কিংবা আত্মহত্যা করতে। কিন্তু কি লাভ হতো তাতে? পৃথিবীর তো কিছুই যেত-আসত না। চৈতিও অবিচল ছিল তার পথে; তাই জীবনকে জীবনের মতোই বইতে দিলাম।

    হঠাৎ খেয়াল করলাম, চৈতি কাঁদছে! তা দেখে কেন যেন পাষাণের মতো শব্দ করে হাসতে ইচ্ছা হচ্ছিল। তবু চুপ থাকলাম। সে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। আমি দৃষ্টিতে ভেজা চৈতিকে দেখলাম। এমন তো হয়নি কখনো! কত তাকিয়ে থেকেছি পরস্পরের চোখে চোখ রেখে। কিন্তু সেদিন আর সেই দৃষ্টি ছিল না। সম্পূর্ণ আলাদা একটা কিছু ছিল সেই দৃষ্টি বিনিময়ে।

    চৈতির অদ্ভুত একটা ক্ষমতা ছিল। সে অনেক সময় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট মনের কথা বলে দিতে পারত। আমি হাজার চেষ্টায়ও তা পারতাম না। তাই মাঝেমধ্যে তাকে বলতাম আমার মনের কথা বলতে। কিন্তু তখন সে ব্যর্থ হতো। আবার মাঝেমধ্যে হঠাৎ করেই বলে দিত, আমি কি ভাবছি। আমি তার মনের ভাষা পড়ার সেই দৃষ্টি চিনতাম। ওই মুহূর্তে সে সেই দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। আমি তাকে পড়তে দিতে চাইলাম না। নামিয়ে নিলাম চোখ, মুখ। এমনকি মাথাটাও।

    চৈতি পড়তে পেরেছিল কি না জানি না। তবে আমি দৃষ্টি লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। তাকালাম তার চোখে। মুহূর্তে একটা শীতল হাওয়া বয়ে গেল আমাকে ছুঁয়ে। লক্ষ্য করলাম, আমি চৈতির চোখের ভাষা পড়তে পারছি – তুমি বহুদিন মজা করে বলেছিলে, আমাকে ছুঁয়ে শিহরণ জাগাতে। আমি দুষ্ট অপবাদ দিয়ে তোমাকে সরিয়ে দিয়েছিলাম। জানি তুমি পবিত্র। না হয় সেই সময়গুলোতে এমন কিছু সুযোগ ছিল, যাতে তুমি আমি ভেসে যেতে পারতাম। তুমি একবার ছুয়ে দিলে গলে যেতাম মোমের মতো। কিন্তু তুমি তা করোনি। তোমার চিন্তাভাবনা সুদূরপ্রসারী ছিল, যা তোমার দৃষ্টিতেই থাকত। আর সেই দৃষ্টি দেখলেই তোমার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যেত।

    আজ জীবন অনামুখী। তুমি প্রশ্ন করলে একটা উত্তরও দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর মিথ্যা কৈফিয়ত তোমার কাছে দিতে পারব না কোনো দিন। তুমি তো জানো, এটাই আমাদের বিদায়ের ক্ষণ। তুমি চাইলে এখানেই আজ সেই মজা করে বলা কথাটার বাস্তবায়ন করতে পারো। নাও! আমি প্রস্তুত।

    চৈতির দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল। আমি আর কিছুই পেলাম না সেখানে। ভাবলাম, যা পড়েছি সেটা আমার কল্পনা। আবার কেন জানি মনে হচ্ছিল, যা পড়েছি তা একদম সত্য।

    প্রহর শেষে বিল মিটিয়ে নীরবে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। কেউ কিছু বলতে পারলাম না। চৈতির অস্তিত্ব বিলীন করা দরকার, তাই তাকে রেখে একা একা আনমনে হাঁটতে লাগলাম ফুটপাথ ধরে।

    হঠাৎ মনে হলো, চৈতি আমার নাম ধরে ডাকছে। তবু থামলাম না। এমনকি ঘুরেও তাকালাম না। হয়তো এটা আমার মনের ভুল। আবার সত্যও হতে পারে। তবে এটা স্পষ্ট জানতাম, চৈতির রাস্তা এটা নয়। সে এখন অন্য পথের পথিক।

    রাজনগর, মৌলভীবাজার থেকে
    ০১৭৩৫ ২৬৫ ৭৯৫, +৪৪৭ ৭৯৩ ৪২৩ ০৯১
    facebook/tofayelrule

     

    1. No chapters published yet.
    Note