
খুজি
খুজি
মুহসিন আবদুর রহমান
প্লেনে ভ্রমণ আমার কাছে এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক যাযাবর (ছদ্মনাম) তাঁর ‘দৃষ্টিপাত’ গ্রন্থে বিমানযাত্রা প্রসঙ্গে একটি অসাধারণ পর্যবেক্ষণ করেছেন—“আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ।” এই কথাটি আমি অন্তর দিয়ে অনুভব করি এবং সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করি।
যাযাবরের কথার সুর ধরে বলতে চাই—বিমান দিয়েছে গতি, কিন্তু বাড়িয়ে দিয়েছে অস্থিরতা আর দুর্গতি। আকাশে ওড়ার এই যান্ত্রিক আয়োজন যেন মানুষের ভ্রমণ থেকে রোমাঞ্চ নয়, বরং মানবিক স্পর্শটুকুই কেড়ে নিয়েছে।
বিমান ভ্রমণ আমার মধ্যে কোনো শিহরণ তো সৃষ্টি করেই না, বরং এর আবেগহীন রকমারি-ঝকমারি আমাকে নিরন্তর বিরক্তি ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ঠেলে দেয়। প্রথমত, টিকেট সংগ্রহ করাই এক ঝক্কি। বার বার ধরণা দিয়ে হাত-পায়ে ধরে বুকিং করা ও টিকেট পাওয়া এক চরম দুর্ভোগের এবং পরম ভাগ্যের ব্যাপার।
টিকেট কিনেই শেষ নয়, তা আবার কনফার্ম করতে হবে।
কনফার্ম করার পর রিকনফার্ম।
তারপর যাত্রার দিন শহর ছেড়ে বহুদূরে অবস্থিত এয়ারপোর্টে বিমান ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের দুই তিন ঘণ্টা আগে পৌছে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাতের ভঙ্গিতে নিজেকে সম্পূর্ণ সপে দিতে হবে।
তারপরই শুরু হয়ে যাবে তুলকালাম কাণ্ড। লেগে যাবে টানা হেচড়া। ঘাটে-অঘাটে এটা করো, ওটা ধরো, সেটা ছাড়ো, এটা ঠেলো, ওটা টানো, এটা ওঠাও, ওটা নামাও, এটা লেখো, ওটা কাটো, এটা দেখো, ওটা দেখাও। কতো রকমের চেকিং, কতো রকমের বায়নাক্কা। গাট্টিবোচকা তো আছেই, দেহের এমন স্থান নেই যেখানে তারা চেকিং করার নামে খোচা, সুড়সুড়ি ও কাতুকুতু না দেবে। নাজেহালের একশেষ।
প্রতি পদক্ষেপে ভ্রূকুটি আর সন্দেহ যেন আমি এক দাগী আসামি। ব্যাপারটা অবশ্যই অভদ্র ও চরম অবমাননাকর। লাঞ্ছনার এখানেই শেষ নয়। চেকিং ফেকিংয়ের এ দুস্তর পথ অতিক্রম করে উড়োজাহাজের খোলের মধ্যে বসতে না বসতেই কোমরে দড়ি। যাকে বলে সিটবেল্ট। আমি যেন ধরা পড়া পলাতক জেল কয়েদি, আবারও পলায়ন উদ্যত। ফাসেন ইওর সিটবেল্ট (এট্রণভহমলর ণর্টঠণর্ফ, সিটবেল্ট বেধে নাও) বলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে ফেলা। অপদস্থের চূড়ান্ত।
কিন্তু আজ থেকে বছর পঞ্চাশ আগে অবস্থা এমন ছিল না। আমি তখন আমেরিকান এমবাসির চাকরি নিয়ে জয়েন করেছি ঢাকার কনসুলেট অফিসে। মাস তিনেক পর শুনি, আমাকে পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী করাচি যেতে হবে। প্লেনের টিকেট ওরাই কিনে দিল, ফার্স্ট ক্লাসের। এর আগে কখনো প্লেনে উঠিনি। প্লেনেও যে ফাস্ট ক্লাস আছে তাও জানতাম না।
আজকাল প্লেনে চড়ে পৃথিবীর এখানে-সেখানে উড়ে যাওয়াটা ডাল-ভাত হয়ে গেছে। কিন্তু আগে প্লেনে উঠে দূর দেশে যাওয়াটা ছিল রীতিমতো একটা ব্যাপার।
আমার করাচি গমন পরিবারের সবার কাছে দারুণ একটা ঘটনা হয়ে উঠলো। আমাকে
সি-অফ করতে বাবা-মাসহ অনেকেই এয়ারপোর্টে হাজির হলেন। মা তো ভয়ে অস্থির, ছুতেই প্লেনে উঠতে দেবেন না।
- No chapters published yet.
